ক্যাম্পাসলিড নিউজ

জাবিতে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড বাতিল করতে ‘উড়োচিঠি’

জাবি প্রতিনিধি:

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লোক প্রশাসন বিভাগের সভাপতির বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকা ও আরেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বোর্ড বসার আগেই পছন্দের প্রার্থীদের ঠিক করে রাখার অভিযোগ তুলে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড না বসানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকটি দফতরে উড়োচিঠি পাঠানো হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আগামীকাল সোমবার (১০ জুলাই) লোক প্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. নুরুল আমিনের অধীনে বিভাগের নতুন শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হবে। তবে মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এতে আরো উল্লেখ করা হয়, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ না থাকায় এই নিয়োগ বোর্ড নানা অজুহাতে ছয়বার স্থগিত করিয়েছেন বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমান। এছাড়া তিনি নিজেও সভাপতি থাকাকালীন সময়ে নিয়োগ কেন্দ্রিক বিতর্কিত ছিলেন।

চিঠিতে বলা হয়, আগামীকালের নিয়োগ বোর্ডে কাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হবে- তা আগেই বিভাগের বর্তমান সভাপতি মো. নুরুল আমিন ও সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমান ঠিক করে রেখেছেন। তারা লোকদেখানো নিয়োগ বোর্ড বসানোর চক্রান্ত করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এতে আরো বলা হয়, আগেই ঠিক করে রাখা প্রার্থীরা হলেন- নুরুল্লাহ নিয়াজ, রেজওয়ানা তাসকিন, ফাইরুজ আনিকা, আতিকা কাফি ও তাসফিয়া রিফাত। এদের মধ্যে, নুরুল্লাহ নিয়াজ মাদরাসার ছাত্র ছিলেন৷ এর আগে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের বিরুদ্ধে মাদরাসায় পড়াশুনার দায়ে সর্বোচ্চ ফলাফলধারী কয়েকজন নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিভাগের ৩৮তম ব্যাচের রেজওয়ানা তাসকিন একই বিভাগের ৩৮তম ব্যাচের রাজিব নূরের স্ত্রী। চাকুরী সুত্রে বিসিএস ক্যাডার রাজিব নূর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বরত ছিলেন। সে সময় তিনি তার স্ত্রীকে চাকুরি দেওয়ার শর্তে অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানকে দশ লাখ টাকার প্রজেক্ট পাইয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ফাইরুজ আনিকা বিভাগের শিক্ষক মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী। আনিকার ফলাফল ভালো করানোর জন্য অধ্যাপক মো. নুরুল আমিন ও মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগের ফলাফলে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উঠে। এছাড়া সম্প্রতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের সাথে বিদেশ থেকে একটি বই প্রকাশ করেছেন আনিকা। তবে বইটির পুরো কাজই করেছেন তার স্বামী মাহফুজুর রহমান।

এদিকে বিভাগের সভাপতি মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আরেক প্রার্থী আতিকা কাফির স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিকভাবে কারসাজি করার অভিযোগ রয়েছে। তখন কারসাজির তথ্য প্রথম সারির কয়েকটি গণমাধ্যমে উঠে আসে। এরপর পরীক্ষার খাতা পুনরায় মূল্যায়নের জন্য উপাচার্য বরাবর লিখিত আবেদন জানান শিক্ষার্থীরা। এমনকি উক্ত ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তৎকালীন উপাচার্য বরাবর আবেদন জানান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক জেবউননেছা।

এবিষয়ে অধ্যাপক জেবউননেছা বলেন, ফলাফল কারসাজি করার অভিযোগ শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে দেখাছি এবং আমার শিক্ষার্থীরা আমার কাছে অভিযোগ করেছিলো ফলাফল কারসাজি ব্যপারে। সেসময় বিভাগের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় আমি বিভাগের সভাপতি হিসেবে এর সুরাহা চেয়ে তদন্ত সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উপাচার্য বরাবর আবেদন করেছিলাম। যদিও পরে সে আবেদেনের প্রেক্ষিতে কোনো ব্যাবস্থা নেওয়া হয়নি।

তিনি আরো জানান, আমি সভাপতি থাকা অবস্থায় এই নিয়োগের বোর্ড তিন-চার স্থগিত হয়েছিলো। কিন্তু আমি এখনো জানিনা কেনো স্থগিত হয়েছে।

সে সময় আতিকার সহপাঠীরা গণমাধ্যমকে জানান, ‘স্নাতকে আতিকার ফলাফল ৩ দশমিক ৫১ কিন্তু স্নাতকোত্তরে তার ফলাফল হয় ৩ দশমিক ৯৭। হটাৎ করে তার ফলাফল এমন হবে, তা কল্পনার বাইরে। এখানে মো. নুরুল আমিন স্যারের হাত রয়েছে কারণ স্যারের সাথে আতিকার ভালো সম্পর্ক ছিলো। স্নাতকোত্তর থিসিস গ্রুপের মৌখিক পরিক্ষায় শুধুমাত্র আতিকাকে ‘এ প্লাস’ মার্ক দেওয়া হয়। এমনকি ১৩ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে আবেদনের শেষ সময় ছিলো। পরে সেখানে তার চাকরি হয়।’

এছাড়া আরেক প্রার্থী তাসফিয়া রিফাত বিভাগের বর্তমান সভাপতি মো. নুরুল আমিনের থিসিসের ছাত্রী। তার বিরুদ্ধে তাসফিয়া রিফাতের ফলাফলে অনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ রয়েছে। যার প্রমাণাদি বিভাগে রয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে চিঠির সঙ্গে এসব অভিযোগের কিছু তথ্য প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়। যেসব তথ্যপ্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। যার মধ্যে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের মেসেঞ্জারের একটি স্কিনশটও রয়েছে। যেখানে তিনি তিনজন প্রার্থীর নাম উল্লেখ করে লিখেছেন, এই তিনজনের বাইরে যেন কেউ জাহাঙ্গীরনগরে না আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের পহেলা এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। পরে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ও ০৪ মে নিয়োগ বোর্ড আহ্বান করা হয়। তবে দু’বারই অদৃশ্য কারণে বোর্ড স্থগিত করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। পরে ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী ফের নিয়োগ বোর্ড আহ্বান করা হয়। এবারও রহস্যজনক কারণে বোর্ড স্থগিত করা হয়। এছাড়া চলতি বছরের ৩১ মে পুনরায় নিয়োগ বোর্ড আহ্বান করা হলেও শেষমেশ বোর্ড স্থগিত করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমান বলেন, উড়ুচিঠির ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। মেসেঞ্জারের একটি স্কিনশট এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এগুলো এখন বানানো যায়।

বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক মো. নুরুল আমিন বলেন, এগুলো সব ভিত্তিহীন, গুজব। আমার বিরুদ্ধে এসব বানোয়াট কথা বলা হচ্ছে। যাকে নিয়ে বলা হচ্ছে (আতিকা কাফির) সে আবেদন’ই করেনি। অথচ তাকে নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। এই এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page