ক্যাম্পাসলিড নিউজ

অমর একুশ: জাবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা

জাবি প্রতিনিধি:

১৯৪৮ সালে যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; তারই প্রতিবাদে ফেঁটে পড়েছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজ।

এই ক্ষোভ থেকেই ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি তরুণরা মাতৃভাষার জন্য ঢাকার রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভাষাসৈনিক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর বলেন,কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’এই রকম কবিতা ও গান তরুণদের মধ্যে জাগিয়েছে অনুপ্রেরণা। তা থেকেই বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সংগ্রামের অনুপ্রেরণার বীজ বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপ্ত হয় । এভাবেই বাঙালি জাতির মাঝে বোধের জাগরণ ঘটে। তখন থেকেই একুশ মানেই সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।আর এ অনুপ্রেরণা নিয়ে কীভাবছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা?

২১শে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের আল-আমীন হোসাইন রুবেল (৪৯ ব্যাচ) বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য ছাত্র-জনতার প্রাণ উৎসর্গ করার বিষয়টিতে আমাদের জন্য একটা শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো আমরা কোন জুলুমের কাছে মাথা নত করিনা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন শুধু মাত্র আমাদের উপর অপরিচিত ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না বরং এটা ছিল নানান ধরনের শোষণ ও বৈষম্যের প্রথম গণ-বিস্ফোরণ। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। প্রতিবছর ভাষার মাস আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় অন্যায়- অবিচার, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে বাঁচার।

তিনি আরও বলেন, দেশের বেশিরভাগ সংকটে বিশেষ করে নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ সকল যৌক্তিক দাবিতে ছাত্রসমাজ প্রথমে এগিয়ে এসেছিল। এখনো দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে ছাত্ররা এগিয়ে আসবে, রাষ্ট্রকে পথ দেখাবে এটাই কাম্য। ভাষার যথাযথ সম্মান রক্ষা করার জন্য সবার আগে দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে হবে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমন আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের হওয়া প্রয়োজন তেমনি মাতৃভাষার উপর গুরুত্বও আরোপ জরুরি। এর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের বিকল্প নেই।

বাংলা বিভাগের (৫০ ব্যাচ) শিক্ষার্থী লাদিবা নীরা বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি ঠিক আগের দিনে বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অনেক আশা-নিরাশার কথা বলতে ইচ্ছা করছে। বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের, বাঙালিদের কত স্বপ্ন! তাইতো, সেদিন স্বপ্নবাজ তরুণেরা নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছিলো। অথচ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছিলাম, ২১ ফেব্রুয়ারি কী হয়েছিলো তা বলতে পারছেনা এ-যুগের তরুণেরা! ইংরেজি বলতে পারলে যে গর্ববোধ করি আমরা, বাংলা বলতে পারি সেই জন্য কী গর্ববোধ হয়? -হয় না! ইংরেজি জানা একটি বাড়তি দক্ষতা হতে পারে, কিন্তু না জানলে আমি অদক্ষ এটি কিন্তু নয়। পাকিস্তানি শাসকেরা আমাদেরকে নিজেদের মায়ের ভাষায় ভাব-প্রকাশ করতে দিতে চায়নি। এখন তফাত হচ্ছে আমরা স্বেচ্ছা অধীনতা, কিংবা স্পষ্ট করে যদি বলি গোলামি -কেই স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি। আমাদের এ-যুগের সচেতন অভিভাবকেরা, যারা খুব গর্বের সাথে বলেন, আপনাদের বাচ্চা ইংরেজি বলতে পারে, খুব ভালো কথা। কিন্তু কখনো গর্বের সাথে বলবেন না, বাচ্চা ইংরেজি বলার কারণে বাংলা বলতে পারেনা। এতে আপনাদের শিক্ষায় প্রশ্ন ওঠে। ভাষা আন্দোলনের ৭২ বছরে এসেও আমাদের আফসোস করতে হচ্ছে, এ দেশে বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা একটা খিচুড়ি পদ্ধতি প্রচলিত। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা এখনও চালু হয়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুধু মাত্র একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না। এটি পরবর্তীতে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিণত হয় এবং যার ভিত্তির উপর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পত্তন হয়। একমাত্র জাতি হিসেবে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, আর কতদিন উপর উপর এই গর্ব করবো! পূর্বসূরিরা যা করে গেছেন, তার ঐতিহ্য রক্ষায় আমাদের নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি কী? এখন বলবেন না, এ এটা কেন করেনি, ওর ওটা করা উচিত। আপনি নিজের দায়িত্ব পালন কতটা করেছেন? বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! আমরা আমাদের ভাষার ঐতিহ্য সমুন্নত রাখবো, এই একটি মাত্র আশা ব্যক্ত করলাম। বাংলা ভাষা অমর হোক। ভাষা শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল হাসান (৫০ ব্যাচ) বলেন, অমর একুশ বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমরত্বকে তুলে ধরে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছরে সেই অমরত্বের মর্যাদা আমরা এখনো দিতে পারিনি। ভাষার জন্য এই দিনটি স্মরণীয় অবশ্যই কিন্তু আমরা শুদ্ধ বাংলার চর্চা থেকে দূরে যাচ্ছি। ক্রমাগত ইংরেজি শিখতে গিয়ে, বাংলায় প্রচুর ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাকে আমরা একটি জগাখিচুড়ি ভাষায় রূপান্তরিত করছি, দিনে দিনে এটি একটি হাইব্রিড ভাষায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতির যথার্থ চর্চা না থাকায় ক্রমাগত আমাদের নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য থেকে, তাদের শেকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একজন তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয়, শুদ্ধতম ইতিহাসের চর্চার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সকল স্তরের মানুষকে উদ্যোগী হওয়া উচিত।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জুুবাইর ইসলাম জিয়ান (৫০ ব্যাচ) বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের ভাষার কথা মনে পড়ে।কিন্তু আদৌ কি ভাষাকে আমরা ভালোবাসি বা অনুভব করি?তরুণদের দিকে তাকালে ভালোভাবেই বুঝতে পারা যায়।তরুণরা যেমন ভাষাকে শুধু দায় সাড়া ভাবে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম মনে করে।ঠিক তেমনি কর্তা লোকেরা ভাষাকে দাসীর মত ব্যবহার করে। এই কী আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্ব? ভাষাকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা উচিৎ বরং ভাষা হিসেবেই চর্চা বাড়ান হোক।এটা মহাকালের চাহিদা।রাজনৈতিক সংগঠন চিরকাল থাকে না।আমরা বাংলা ভাষাকেও তাই মৃত হতে দিতে পারি না।অনুবাদের দ্বারা যেমন বাংলা সাহিত্য পরিচিতি লাভ করবে তেমনি অন্য ভাষার সাহিত্যের ভাবে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে, বাংলা ভাষাও তাতে সমৃদ্ধ হবে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চার বেহাল দশা। এ শাখার গবেষকদের এ বিষয়ে খেয়াল দেয়া উচিত।
বাংলা ভাষাকে তাজা রাখতে শব্দের চর্চা বাড়াতে হবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে সাহিত্যিকদের। অভিধান কজন পড়ে? বরং লেখার মাঝে মানানসই কয়েকটি শব্দ বসিয়ে দিন।অপরিচিত ব্যঞ্জনের স্বাদ পেয়ে নতুন শব্দের চর্চা হবে।
এ কাজের জন্য সাহিত্যিকদের সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার থাকা চাই।অনেক মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। পথও বাকি বহুদূর। ফরাসিদের মত ভাষাকে শল্য-চিকিৎসার মত কাটাছেঁড়া ও নতুন বুননে পোক্ত করা জরুরি।

মহান ভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো রায়হানুল‌ ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান ভাষা শহিদদের ত্যাগের ও মহিমার স্মৃতি স্মরণ করে তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করি।

১৯৪৮ সালে যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; তারই প্রতিবাদে ফেঁটে পড়েছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমরা বাংলাকে পাই প্রাণের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এবারের ২১শে ফেব্রুয়ারি এটাই হোক আমাদের স্লোগান- ‘বিকৃত বাংলিশ ভাষা নয়, বাংলা ভাষা রক্ষায় হব প্রত্যয়’।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page