ক্যাম্পাসলিড নিউজ

কুবিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা, শিক্ষক-প্রশাসন দ্বন্দ্বে জিম্মি শিক্ষার্থীরা!

কুবি প্রতিনিধি:

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) শিক্ষকদের সাত দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। ক্লাস বর্জনে সৃষ্ট অচলাবস্থায় সেশনজটে পড়ার আশংকা করছে শিক্ষার্থীরা।

গত ১৩ ও ১৪ মার্চ সাত দফা দাবি আদায়ে ক্লাস বর্জন করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। দাবি আদায় না হওয়ায় গত সোমবার (১৮ মার্চ) ফের ৬ কর্ম দিবস অর্থাৎ ১৯ হতে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয় তারা। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ ৫ম দিনের মতো ক্লাস বর্জন অব্যাহত ছিলো।

শিক্ষকদের দাবি গুলো হলোঃ

১. ১৯ ফেব্রুয়ারী উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষকদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলায় নেতৃত্ব দানকারী কর্মকর্তা জনাব মোঃ জাকির হোসেনের সাময়িক বহিষ্কারপূর্বক সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার ও জড়িত সকলের সর্বোচ্চ শান্তি নিশ্চিতকরণ এবং হামলায় মদদদানকারী প্রক্টর জনাব কাজী ওমর সিদ্দিকীর অপসারণ।

২. ঢাকাস্থ গেস্টহাউজ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য অবমুক্ত করা।

৩. অধ্যাপক গ্রেড-১ ও অধ্যাপক গ্রেড-২ পদে পদোন্নতির জন্য আবেদনকৃত শিক্ষকদের অবিলম্বে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।

৪. কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মোতাবেক বিভিন্ন বিভাগে বিভাগীয় প্রধান ও অনুষদসমূহের ডিন নিয়োগ এবং ইতোমধ্যে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যেসকল বিভাগে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের প্রত্যাহার করা।

৫. শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে আইন বহির্ভূত অবৈধ শর্ত আরোপ করে জ্যেষ্ঠতা ক্ষুণ্ণ করার মাধ্যমে যে সীমাহীন বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে দ্রুততম সময়ে সেসবের নিষ্পত্তিকরণ।

৬. ৯০তম সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত বিতর্কিত শিক্ষাছুটি নীতিমালা রহিত করে পূর্বের নীতিমালা বহাল রাখাসহ ৮৬তম সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করা।

এদিকে শিক্ষক সমিতির এমন কর্মসূচির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধেকের বেশি বিভাগে ক্লাস ও মিডটার্ম পরিক্ষা ঈদের পর পর্যন্ত পিছিয়েছে। কিন্তু ঈদের পরেও এই অচলাবস্থার অবসান হবে কিনা, সেটা বলা যাচ্ছেনা এখনো। আর এমন পরিস্থিতিতে সেশনজটে পড়ার আশংকা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষকদের দাবিগুলো যৌক্তিক হলে উপাচার্যের উচিত মেনে নিয়ে শিক্ষকদেরকে ক্লাসে ফেরানো। উপাচার্য ও শিক্ষকের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তার প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপর পড়বে কেন?

মুস্তাফিজুর রহমান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, উপাচার্য স্যারও একজন শিক্ষক। তিনি কি শিক্ষকদের অবস্থা বুঝেন না? তাদের কোনো দাবি তো অযৌক্তিক না। তবু্ও কেন শিক্ষকদের আন্দোলন নামাতে বাধ্য করলেন? শিক্ষকরা তিন-চারবার চিঠি দিয়েও ভিসি স্যার কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এর মানে ভিসি স্যারই হয়তো শিক্ষার্থীদের ক্ষতি চান।

ইসরাত জাহান নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকরা আন্দোলনে নামা মানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেয়া। এভাবে শিক্ষার্থীরা সেশন জটে পড়ে যায়। তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই নষ্ট হয়ে যায়। এর দায়ভার কে নিবে? শিক্ষকদের এই আন্দোলনের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম, ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে যতদ্রুত সম্ভব এটির সমাধান করা দরকার।

গোলাম মোস্তফা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, করোনা মহামারির কারণে আমাদের জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে গিয়েছে। এখন উপচার্য ও শিক্ষক সমিতির মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব চলছে তা কখন শেষ হবে জানি না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের জীবন বিশ্ববিদ্যালয়েই শেষ হয়ে যাবে। আমাদের পরিবারের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমরা আশা করবো উভয়ই শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিবেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলতে চাইলে বিষয়টি ‘রাজনৈতিক’ উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অনেকেই।

তবে ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, একদিকে শিক্ষকরা ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। এটা শিক্ষার্থীদের মানসিক অস্থিরতায় রাখছে। পবিত্র রমজান মাস চলমান, তারা বাড়ি যেতে পারছে না আবার ক্লাসও নিয়মিত হচ্ছে না। এতে সেশনজট বাড়ার আশঙ্কাও আছে। শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ তারা এমন কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না যেটা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচিত শিক্ষকদের দাবির বিষয়গুলো বিবেচনা করে একটি শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্তে আসা।

শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুল ইসলাম শেখ বলেন, শিক্ষকরা তাদের নায্য দাবির জন্য আন্দোলন করতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর শিক্ষক সমিতির প্রতি পরামর্শ থাকবে তারা যেন আন্দোলনের ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে।

শিক্ষক সমিতির দাবির সাথে একমত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখনো তাদের দাবিগুলো কি জানি না, তাই সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারবো না।

শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাদের কোন ক্ষতি হোক সেটা আমরা কেউই চাই না। আমার এই বিষয়ে খুবই সতর্ক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের যারা পাঠদান দেয় তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। শিক্ষকদের নায্যদাবি গুলো নিয়ে উপাচার্য স্যারের সাথে অনেকবার বসেছি, চিঠি দিয়েছি কিন্তু স্যার কোন কর্ণপাত করেনি। শিক্ষকরা ভালো না থাকলে, শিক্ষার্থীরা ভালো থাকবে না, শিক্ষার্থী ভালো না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় ভালো থাকবে না। উপাচার্য যদি আমাদের নায্যদাবি গুলো মেনে নেন তাহলে আমরা অতিরিক্ত ক্লাস, সবকিছু নিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতে সেশনজট না পড়ে সেই ব্যবস্থা নিবো।

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো চাইলেও যিনি ভালো চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে তিনি ভালো চান না। আমরা উপাচার্যের কার্যালয় গিয়ে স্যারকে বলি, স্যার আপনি চাইলে আমাদের সংকট এক ঘন্টায় সমাধান হবে আর না চাইলে তা সম্ভব না। তখন তিনি উত্তরে বলেন ‘আমি এ পরিস্থিতিকে কোন সংকট মনে করি না, তোমাদের যা ইচ্ছে করতে পারো।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম. আবদুল মঈন বলেন, শিক্ষক সমিতি আমার কাছে একটা চিঠি দিয়েছিল। চিঠির বিষয়ে তাদের সাথে আমি কার্যালয়ে বসি। তাদের সাথে কথা হয়, তাদের পক্ষ থেকে শুধু সভাপতি, সেক্রেটারি কথা বলবে, কিন্তু তারা সাইড টক শুরু করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে সদস্যরা বলেন আমরা এখানে কথা বলতে না পারলে এখানে কেন আসছি? এক পর্যায়ে তারা চলে যায়।

তাদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের বলেছি আপনাদের দাবি আইনসম্মত হলে আমি মেনে নেব। ক্লাস বর্জনের বিষয়ের আমি তাদের অনুরোধ করছি। আপনারা ক্লাস বর্জন করবেন না। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page