ক্যাম্পাসলিড নিউজ

জাবি শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

জাবি প্রতিনিধি:

‘স্বপ্ন যাবে বাড়ী আমার’ ইদ আসলেই হাবিব ওয়াহিদের গানটি আমাদের আপন শিকরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে গৃহহারা একজন শিক্ষার্থী ভর্তি যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে আপন পরিবার, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে এসে পড়ে। সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক মিড-টার্ম, এ্যাসাইনমেন্ট, প্রেসেন্টেশনসহ নানা ব্যস্ততা থাকে। তারই মধ্যে হুট করে প্রকৃতির নিয়মে যখন ইদ নামের দীর্ঘ ছুটি উঁকি দেয় তখনই চঞ্চল হয়ে উঠে আপণ চিত্ত। প্রতিনিয়ত নিজ শিকরের কাছে যাওয়ার স্বপ্ন বুনতে থাকে। ভাবতে থাকে কবে প্রিয় মানুষদের সাথে সাহরি খাবে, ইদ উৎযাপনে আপণজনদের সঙ্গ পাবে। মনের মধ্যে এক প্রকারের উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে। তেমনি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাজারো ব্যস্ততার মাঝে ইদের ছুটিতে নিজ গৃহে চলে যাচ্ছে। আর সে সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইদ নিয়ে কি ভাবছে? তাদের ইদ ভাবনা তুলে ধরেছেন ডেইলি দর্পণের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইয়াসির আরাফাত সুমন।

সুমাইয়া আক্তার (বাংলা বিভাগ,৫০ তম আবর্তন) বলেন, ‘ইদ’ আসলেই শুরু হয় ঘরে ফেরার দৌড়ঝাঁপ। সবুজ ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে আরও সবুজ।ঘাসগুলো স্বাধীনতার অপব্যবহার করে বড় হওয়ার চেষ্টায় মেতে ওঠে।তবে ক্যাম্পাসে প্রতিনিয়ত বিচরণশীল শিক্ষার্থীদের সেদিকে ভ্রূক্ষেপের অবকাশ নেই ‘ইদ মৌসুমে’। টিউশন, এক্সাম আর প্রতিদিনের রুটিনকে পাশ কাটিয়ে তল্পিতল্পা ঘাড়ে করে রওনা হয় বাড়ির পথে। এত বড় ছুটি বছরে দু-একবারের বেশি মেলে না। যে কারণে ইদের ছুটি যেন ছাত্রজীবনে পূর্ণিমার চাঁদ হাতে পাওয়া। সবার মতো আমিও চাতকের মতো চেয়ে থাকি সেই অবকাশের প্রত্যাশায়। ঘরে ফিরে মা-বাবা, ছোট্ট ছোট্ট ভাই-বোন, স্বজনদের চেহারা দেখলেই বিগত দিনগুলোর ক্লান্তির অবসান ঘটে। সবার মতো আমারও প্রিয় আমার পুরোনো ঘরের বয়স্ক ধুলো। ঘর গোছানোর ছলে ঘরের জিনিসগুলো এলোমেলো করতে করতে আমারও চোখের কোণে জল আসে। ছুটি শেষ হতেই আবারও হাসি-কান্নার পাঠ চুকিয়ে ক্যাম্পাস লাইফের ব্যস্ত রুটিনে প্রবেশ করি।জীবনের এই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই বিকাশ ঘটে আমার আত্মার। ‘ইদ’ যেন সে পথেরই একটি পদক্ষেপ!

মুহীম আহমদ (কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ৪৬ ব্যাচ) বলেন, ঈদ মানে আনন্দ এবং ঈদ মানে খুশি। তবে জীবনের প্রতিটি বাঁকে আনন্দ যেভাবে পরিবর্তনশীল, ঈদ-আনন্দ যেনো সেই ধারার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান এই প্রযুক্তির দুনিয়ার বেষ্টনে মানুষের বয়সের সাথে সাথে ঈদ আনন্দের বেশ ভাটা পড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষত, শৈশবের ঈদের যে আমেজ – নতুন পোষাক কিংবা সেমাই ফিরনীর মধ্যে পেতাম ধীরে ধীরে পড়ন্ত কৈশোরে সেই আমেজগুলোকে অনুভব হয়ে উঠে না। মুঠোফোনের গল্পতে কিংবা দুই-তিনটি ছবিমুহুর্ত সংগ্রহ করতে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

এরপর এসে পড়ে জীবনের সেরা পর্যায়-যৌবন। অধিকাংশের মতে যৌবনের অন্যতম প্রতিশব্দ ক্যাম্পাসজীবন। জীবনের এই পর্যায়ে মানুষের উচ্চশিক্ষার সূচির সাথে সাথে কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুক্ত হয় নতুন পরিচয়ের অসংখ্য মানুষের সম্পর্ক, এই সম্পর্ক গড়তে গিয়ে দূরে থাকা পারিবারিক, আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্কের প্রতি বেদনা অনুভূত হতে থাকে।জীবনের ঠিক এই পর্যায়ে ঈদ যেনো হয়ে উঠে এক আশীর্বাদ। রমজানের ক্লাস, পরীক্ষা এবং ল্যাবের সাবমিশনে জীবন যখন অতিষ্টের চরম সীমায় চলে যায় ঈদের ছুটি বয়ে আনে অন্তরে এক বিশাল শান্তির অবসান। বাড়ি ফিরে ভাই-বোন, বাবা-মায়ের সাথে আলিঙ্গন যেনো ঈদ-আনন্দকে বহুগুণে পরিপূর্ণ করে। নতুন পাঞ্জাবি পরিধান করে আতর-খুশবু মেখে ঈদগাহে গমন, অতঃপর নামাজ খুতবা শেষে কোলাকুলির প্রহর নেমে আসে তখন খুশির বাঁধ যেনো ফেটে ওঠে, অন্য সব মানুষের মুখে স্মিত হাসি দেখামাত্রই যেনো মনে এক পবিত্র-ঐশ্বরিক অনুভূতি জেগে ওঠে। ঈদের এই অনুভূতি পাওয়ার জন্যই জীবনের এই পর্যায়কে আমার খুব উপভোগ্য মনে হয়।

মোস্তাফিজুর রহমান (সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, ৫২ ব্যাচ) বলেন, শৈশবের স্মৃতিচারণে- ইদ আনন্দ নতুন জামা লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা। ছুটির পুরোটা সময়জুড়ে পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়ীক অব্যাহতি নিয়ে কার্টুন দেখে ছুটি উপভোগ করা। সময়ের পরিক্রমায় শৈশবের পাঠ চুকিয়েছি বহু আগেই, পড়াশোনার তাগিদে পরিবার-পরিজন ছেড়ে যান্ত্রিক শহরে ঠাঁই নেওয়া। ক্লাস-পরিক্ষা, ক্যাম্পাস আড্ডার পাঠচক্র সামলে উঠে দিনের একটা বিশেষ সময়টাতে মনের কোণে পরিবারকে মিস করার অনুভূতিটা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। ‘ঈদুল ফিতর’ অর্থাৎ দীর্ঘ একটা ছুটির ফোয়ারা। পরিবার আর ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে আড্ডা। একাডেমিক বাধ্যবাধকতাকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে অস্থায়ী মুক্তি লাভ। ইদ আনন্দের তাৎপর্য ফুটিয়ে তোলায় যথেষ্টতা রাখে। বলাবাহুল্য, ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ি এসেও প্রিয় জাবির নিমিত্তে প্রতিটি স্থানে প্রতিটি মূহুর্ত কাটনোর স্মৃতিচারণ তারা দেয় ঠিকই। কিন্তু আপাততঃ আমি ওই বিষয়টা ছুটি পরবর্তী সময়ের জন্য তুলে রেখে পরিবারের সাথে ইদ আনন্দ ভাগাভাগি করে যেতে চাই।

জান্নাতুল ফেরদৌস সাঈদা (মার্কেটিং বিভাগ, ৫১তম আবর্তন)বলেন, ছোটোবেলা থেকেই “ঈদ” শব্দটা শুনলে অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর পর থেকে কখনো হলের কষ্টকর জীবন, কখনো মিড-টার্ম, কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, কখনো বা টিউশনের চাপ এই সবকিছুর পর যে ঈদের ছুটি তার অনুভূতি সত্যিই আলাদা। যদিও মাথায় সেমিস্টার ফাইনালের চিন্তা ঘুরছে, তবুও কিছুদিনের জন্য নিজের বাসায়, নিজের রাজ্যে বসবাস, পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদ উদযাপন, সালামি পাওয়া এবং দেওয়া, বহুদিন পর বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা-আড্ডা সব মিলিয়ে আমার কাছে ঈদ খুবই সুন্দর মুহূর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম। জীবনের যেই পর্যায়েই যাই না কেন, আমার কাছে ঈদ মানে সকাল সকাল নতুন জামা পরে, সেজেগুজে পুতুল হয়ে ছবি তুলবো, মার হাতের সেমাই, নিজের হাতের নুডলস খাব, বাসায় মেহমান আসবে, আমরা দাওয়াতে যাব, বন্ধুদের সাথে বের হব, চারিদিকে সবার মাঝেই একটা আনন্দমুখর পরিবেশ থাকবে এটাই ঈদ। আশা করি, সকল শ্রেণি, পেশা নির্বিশেষে সবাই তাদের প্রিয়জনদের সাথে হাসিমুখে ঈদ পালন করুক।

সেলিম আহমেদ (নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ৫০ ব্যাচ) বলেন,অর্ধেক রমজান পেরোতে না পেরোতেই শুরু হয় বাসায় ফেরার কার্যক্রম। যদিও বয়সের সাথে ইদের সেই আবেগ টা অনেকটাই মলিন হয় তবুও এ যেনো এক অন্যরকম প্রশান্তি নিয়ে আসে মনে। বাড়ি যাওয়ার আগেই বন্ধুবান্ধব সিনিয়র জুনিয়র সবাই ইদের কেনাকাটা করে। নিজের জমানো টিউশনের টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য কিছু নিয়ে ঘরে ফেরাটা যেনো অন্যরকম শান্তির।যদিও এবার কিছুটা ঝামেলার জন্য পরিবার নিয়ে শহরেই ইদ করতে হচ্ছে তবুও পরিবারের সাথে সময়গুলো ভালো কাটবে এটাই অনেক আনন্দের।ইদের ছুটি শেষ হতেই আবার শুরু হবে ক্যাম্পাসে ফেরার পালা। এ যেনো এক ঠিকানা ছেড়ে আরেক ঠিকানায় আসা।আসলে মানুষের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা হয়না। শুধু জীবনের কোনো একটা সময় কোনো এক জায়গায় থাকে। জীবিকার সন্ধানে মানুষ বেরিয়ে পরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। ইদ আসলে যেমন একদিকে আনন্দ নিয়ে আসে অন্যদিকে যারা স্বজন হারিয়েছে তাদের জন্যেও নিয়ে আসে কষ্ট। হয়তো গত ইদে ছিলো এই ইদে নেই। তবুও জীবন চলবেই, চালাতে হবেই।পুরো বছরের শত ক্লান্তি,খারাপ লাগা সব মুছে ফেলে ইদ যেনো বসন্তের রঙিন ফুলের মতো সবার জীবনে সুগন্ধ ছড়ায় এই কামনা।সাধ্য অনুযায়ী পাশের অসহায় মানুষকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ইদের আনন্দ সবার কাছে যাতে পৌঁছাতে পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা প্র‍য়োজন। বন্ধুবান্ধব সহ সকলের খোঁজ নেয়াটাও ইদ আনন্দকে বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণে। যে বন্ধুটির সাথে চলার পথে কোনো কারণে মনোমালিন্য হয়েছে তাকে ইদের শুভেচ্ছা জানালে সেও আবার সব ভুলে যাবে। এটাই ইদের সৌন্দর্য।ইদ হোক আনন্দের, ইদ হোক সহমর্মিতা ও ভালোবাসার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page