ক্যাম্পাসলিড নিউজ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে কুবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা

হোসাইন মোহাম্মদ, কুবি প্রতিনিধি:

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এই দিনটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বেদনাঘন দিন। ১৯৭১ সালের এ দিনে বাঙালি জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তান তার পূর্ব পরিকল্পিত ভয়ংকর নীলনকশা বাস্তবায়ন করে। এই নির্মমতার রূপকার ছিল পাক-হানাদার বাহিনী, তাদের দোসর আলবদর, রাজাকার ও আলশামস বাহিনীর নেতারা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যেনো মেধায়-মননে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেকারণেই মূলত এই বর্বর হত্যাকাণ্ড।

মুক্তিযুদ্ধেসময় আমরা কতজন বুদ্ধিজীবী হারিয়েছি তার সঠিক তথ্য না থাকলে ও কিছু সুত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বুদ্ধিজীবী দিবসের জাতীয় সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন নিউজ উইকের তথ্য অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট এক হাজার সত্তর জন। যা বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা শিক্ষাবিদ ৯৯১,সাংবাদিক ১৩,চিকিৎসক ৪৯, আইনজীবী ৪২ এবং অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) ১৬

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় যখন দরজায় কড়া নাড়ছে তার ঠিক দু’দিন আগে এক নজিরবহীন ঘটনার সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। বিজয়ের প্রাক্কালে বেজে ওঠে বেদনার সুর, ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। এই বুদ্ধিজীবী দিবসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শিক্ষার্থীদের ভাবনা নিয়ে লিখছেন মোহাম্মদ জোবাইর হোসাইন

বুদ্ধিজীবী দিবস নিয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ উল্লাহ রাফি ডেইলি দর্পণ কে বলেন, আমি মনে করি দেশের একেকজন বুদ্ধিজীবী, একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান। কিংবা কখনো তারচেয়েও বড় কিছু। একজন জ্ঞানী, গবেষক কিংবা বুদ্ধিজীবী যে নামেই আমরা বলি না কেন তাঁরা একটি সমাজে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তা আমরা সক্রেটিস, প্লেটো কিংবা এরিস্টটল এর দিকে তাকালে উপলব্ধি করতে পারি। পাকিস্তানি বাহিনী দেশসেরা বুদ্ধিজীবীদের কি পরিমাণ ভয় পেতো, সেটি ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের দিকে তাকালে বুঝা যায়। কারণ তারা পরাজয় নিশ্চিত জেনে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে জাতি হিসেবে আমাদের পঙ্গু করে দিতে দেশসেরা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। তারা ঠিকই বুঝেছিলো এই শ্রেণিটাকে যদি নিঃশেষ করে দেয়া যায়, তবে শতবর্ষেও এই জাতি দাঁড়াতে পারবে না। কারণ সমাজে অনেক মানুষ জন্মে, কিন্তু বুদ্ধিজীবী আসেন হাতে গুণা কয়েকজন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি, তার উন্নয়ন ও বিকাশের যে বিপথগামীতা আমরা দেখতে পাই তা নিঃসন্দেহে এই শ্রেণিটির অনুপস্থিতির কারণে সম্ভব হয়েছে। তাই অনস্বীকার্যভাবে এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপর্জয় সমূহের মাঝে সবার আগে থাকবে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস নিয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাবাসসুম ডেইলি দর্পণ কে বলেন, ছোট্ট একটা ব- দ্বিপ যার প্রতি বর্গকিলোমিটার রক্তের দামে কেনা।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে লেখা একটা ইতিহাস।এই ইতিহাস লেখার ভাষাও আমাদের অর্জন করতে হয়েছে রক্ত দিয়ে। সালটা তখন ১৯৭১, বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন পূর্বে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের গতিবিধি বুঝে যায়।তারা বুঝে যায়,এ জাতির সাথে তারা পেরে উঠবেনা।এ এক অদম্য জাতি!জনশূন্য করার পরিকল্পনায় তারা ব্যর্থ হয়ে,মেধাশূন্য করার নীলনকশা সাজিয়ে ফেলে তাই।একটা জাতিকে সমূলে ধ্বংস করার এই একটা নিকৃষ্ট পথ,দেশের সকল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা। ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক,কবি সাহিত্যিক কেউ ছাড় পায়নি সেদিন।যারা সৃষ্টি করেছিল অদৃশ্য এক ঢাল,যা সাহস যুগিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। অন্ধকারে যারা দেখিয়েছিল আলোর পথ। কেউ কবিতার সুরে,কেউ গানের সুরে,কেউ শব্দ দিয়ে,কেউ চিকিৎসা বিলিয়ে,নানাভাবে। বাঙালিই জানে একমাত্র, তারা কি হারিয়েছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সকল বুদ্ধিজীবীদের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাক তাদের কথা যাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে বাঙালির ইতিহাসে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে।

লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাহীন আলম ডেইলি দর্পণ কে বলেন, ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা মিলে বাংলাকে মেধা শূন করার জন্য অনেক হত্যা ও নির্যাতন চালায়। কিন্তু আমার দেশের শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকরা তাদের কাছে মাথা নত করে নাই। কারণ বাঙালিরা অতীতে কারও কাছে মাতা নত করেনি, সেটা আমরা পলাশি যুদ্ধ, তিতুমীর, হাজী শয়ীরতুল্লাহ আন্দোলনের দিকে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারব। আমার ভাইয়েরা ১৪ ডিসেম্বর মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে বাংলা ভাষার পরিবর্তে। বুদ্ধিজীবীরা হলেন আসল দেশপ্রেমিক। তারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও জীবনকে তোয়াক্কা করেননি। কারণ তারা দেশের মানুষের অধিকারের প্রতি সবসময় অটল ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান বাহিনী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে নিজেদের অধীনে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাজারোও বাধা পেরিয়ে আমরা আজ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ, শিক্ষক ও সাংবাদিকরা কোনদিনই এই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবদানকে ভুলবে না। তাঁদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ,অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়েই অব্যাহত থাকবে আমাদের আগামীর পথচলা।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী মুসলিমা আক্তার তন্নি ডেইলি দর্পণ কে বলেন, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে যারা শহীদ হয়েছিলেন তারাই হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও সমাজসেবক ইত্যাদি ব্যাক্তি বর্গ। মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল সাধারণ জনগণ। আর এই সাধারণ জনগনকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদেরর শিক্ষা হচ্ছে ন্যায় ও অধিকার আদায়ে আমরা যেন পিছপা না হই।বুদ্ধিজীবীরা যেমন দেশের জন্য তাদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন, দেশের মানুষের সর্বোপরি কল্যাণের জন্য তারা যেমন অকাতরে নিজের জীবন দিতে দ্বিধাবোধ করেননি, বীর সৈনিক হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন, ঠিক তেমনি যেন আমরা দেশমাতৃকার প্রয়োজনে তাদের মতো করে তৈরি হই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page