ক্যাম্পাসলিড নিউজ

উৎসব-অনুষ্ঠানের চাপে বিধ্বস্ত জাবির শিক্ষা পরিবেশ

জাবি প্রতিনিধি:

পাখি ডাকা, সবুজে ঘেরা ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এক শান্তিপ্রিয় আবাসিক ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত। কিন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিভাগ, ব্যাচ, সংগঠন, জেলা সমিতি, বিয়ে সহ নানা আয়োজনের অনুষ্ঠান যেন পিছু ছাড়ছে না এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ যেন এক মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলা উপভোগ করতে ক্যাম্পাসে হরহামেশা প্রবেশ করছে বহিরাগতদের শত শত বাইক, অটোরিকশা সহ বিভিন্ন যানবাহন। রাতভর চলছে আতশবাজি, কনসার্ট ও উচ্চস্বরে মাইকে গানবাজনা। ফলে তৈরি হচ্ছে যান্ত্রিক কোলাহল, ঘটছে মারাত্মক শব্দূষণ। এতে করে নষ্ট হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি, ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্থানে একইসাথে একাধিক উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। রাতভর কনসার্ট ও অনুষ্ঠানের চাপে দম ফেলার ফুরসত নেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের অন্যতম স্থান সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চের। কনসার্টের বাজনার উচ্চধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ও আবাসিক হল পর্যন্ত। কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গনে হাজারো পসরা নিয়ে বসেছে দোকানিদের মেলা। দর্শনার্থী-ক্রেতাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সেখানে অবস্থান করা দুঃসাধ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) প্রবেশ করলে দেখা যাবে সেখানে উচ্চস্বরে বাজছে গান, চলছে বিভিন্ন বিভাগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পূর্ব প্রস্তুতি। আর বহিরাগতদের চাপে নাজেহাল ওয়াসরুমগুলো। টিএসসির পেছনে সপ্তম ছায়ামঞ্চে প্রতিনিয়ত চলছে জেলা সমিতির বারবিকিউ পার্টি সাথে উচ্চস্বরে গান-বাজনা।

একই চিত্র জহির রায়হান মিলনায়তন ও ছবি চত্বরেও।এদিকে বটতলা, বঙ্গবন্ধু হল, শহীদ সালাম-বরকত হল সংলগ্ন খাবারের দোকান সংলগ্ন এলাকায় রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর দোকান বন্ধ করে দেয়ার নিয়ম থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে খাওয়া-দাওয়া, যানবাহনের উচ্চশব্দ লেগেই থাকে। ক্যাম্পাসের পরিবহন চত্বর, জাকসু ভবনের ভেতরে ও চারপাশে শিক্ষা সমাপনী উৎসবের আয়োজনে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই চলতে থাকে গান-বাজনার আসর।

এসব অনুষ্ঠান দেখতে আসা বহিরাগতদের মাধ্যমে বাড়ছে নেশাদ্রবের অবাধ সেবন, নারী হেনস্তা, মারধরের মতো ঘটনা। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ব্যবহৃত পলিথিন, মাস্ক ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ময়লার স্তুপে পরিণত হচ্ছে সেন্ট্রাল ফিল্ড, মুক্তমঞ্চ, ক্যাফেটেরিয়া, বটতলাসহ ক্যাম্পাসের অধিকাংশ এলাকা।

অতিথি পাখির অভয়াশ্রম খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু লাগাতার অনুষ্ঠান-কোলাহল, আতসবাজি, উচ্চস্বরে মাইকে গানবাজনা, বহিরাগতদের গাড়ির হর্ণ,শব্দ দূষণে পরিযায়ী পাখি বিচরণের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ফলে এবার অতিথি পাখিদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেব পরিচিত হলেও অতীতে এত বেশি উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো না।বড় কোন উপলক্ষে হাতে গোনা কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। যেখানে উৎসাহ সহকারে মানুষ অংশগ্রহণ করতো। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত জন সমাগম শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতায় ফেলছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ জাবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির ফয়সাল বলেন, আবাসিক এলাকায় শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৪৫-৫০ ডেসিবল। কিন্তু ক্যম্পাসে চলে ১০০-১৫০ ডেসিবল। এতে করে যে কেউ বধির হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান উৎপাদন করা। সাংস্কৃতিক চর্চাটাও জরুরি তবে সেটা হবে নির্দিষ্ট জায়গায়। কিন্তু পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই রঙ্গ মঞ্চ করে ফেলা হয়েছে। যেখানে-সেখানে সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে উচ্চস্বরে বিদেশি গানের অসহ্য সাউন্ড ও বিট বাজানো হচ্ছে। এতে করে ক্যাম্পাসে বসবাসরত জনজীবন তো বটেই বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীরাও হুমকির মধ্যে পড়ছে।এত বেশি কনসার্ট ও বহিরাগতদের আগমন হচ্ছে যে এটাকে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না বলে ডিজিটাল পিকনিক স্পট বলা যায়।

রফিক জব্বার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুজাহিদ ফুয়াদ বলেন, এটা বিশ্ববিদ্যালয় নয়তো যেন রঙ্গমঞ্চ। যেখানে সেখানে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে শব্দ দূষণ করা হচ্ছে এবং সেই শব্দকে প্রোগ্রামস্থলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয় না। এমনকি রাত ১টা-২টা পর্যন্ত এ ধরনের গান-বাজনা চলে। এতে শুধু পড়ার পরিবেশেই নষ্ট হচ্ছে না বরং রাতে ঘুমানো যায় না। এমনকি এ বিষয়ে প্রশাসনকেও কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

ফজিলাতুন্নেসা হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী তানজিনা তাবাসসুম তন্দ্রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন এই হলের পাশেই সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের সবাই এসে জড়ো হয়। এক ব্যাচের র‍্যাগ অনুষ্ঠানের জন্য গানের রেওয়াজ চলে। আমার সহ এই হলের অনেকের পরীক্ষা চলছে। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রশাসনও এসব বন্ধ করতে কোন উদ্যোগ নেয় না।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুক্তমঞ্চে সব প্রোগ্রামের আগেই আমার থেকে অনুমতি নেওয়া হয়। আমি প্রত্যেক অনুমতি পত্রেই লিখে এবং মুখে বলে দেই রাত ১০টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। তবু এটা অনেকেই মানছে না। মাত্রাতিরিক্ত শব্দে গান না বাজানো এবং রাত ১০টার মধ্যে সকল অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য আমি সবাইকে আহ্বান করছি এবং তা না করলে আমি কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ জ্ঞান চর্চা করা। একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এখানে সবাই পড়াশোনা করবে এটাই কাম্য। তবে শব্দ দূষণের ব্যাপারটি খুবই দুঃখজনক। গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে গানবাজনা মোটেও কাম্য নয়। আমি প্রক্টরের সাথে কথা বলে রাতের প্রোগ্রামগুলো সীমিত করার ব্যবস্থা নিবো।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page