Uncategorized

বাংলাদেশের অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু চ্যালেঞ্জ

১) অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানির অনুমোদন:

সবচেয়ে মৌলিক অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জামগুলির মধ্যে একটি হল ফায়ার এক্সটিংগুইশার। এটি ছোট- বড় সব ধরনের স্থাপনার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এসব অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আমদানি করা সহজ নয়। প্রতিবার অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র আমদানির জন্য বিস্ফোরক অধিদফতর থেকে দুই দফা অনুমোদন (প্রাক ও চূড়ান্ত) এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অনুমোদন প্রয়োজন। এই অনুমোদনগুলি বেশ কষ্টকর এবং কমপক্ষে ২০/২২ দিন সময় প্রয়োজন হয়। অনেক আমদানিকারক নিরুৎসাহিত হয়ে যায় এবং এই ঝামেলার কারণে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ করেছে, যদিও অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জাম একটি জীবন রক্ষাকারী পণ্য।

২) কাস্টম ক্লিয়ারেন্স এবং শুল্ক:
অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা হল একটি সম্পূর্ণ সিস্টেম যা অনেকগুলি ডিভাইস এবং সরঞ্জাম নিয়ে সংঘঠিত হয়। উদাহরণ স্বরূপ আমদানির সুবিধার জন্য সরকার ফায়ার স্প্রিংকলার সিস্টেমের জন্য একটি এইচএস কোড নির্ধারণ করেছে (84 24 2030) তবুও প্রতিটি পণ্য/যন্ত্র কাস্টমসে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং পৃথক পৃথক ভাবে শুল্ক আরোপ করা হয়। এতে আমদানি ব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়। পাইপ ফায়ার স্প্রিংকলার সিস্টেমের একটি অপরিহার্য অংশ। বলা যায় পুরো সিস্টেমের প্রায় ৬০% পাইপে ব্যয় হয়। বাংলাদেশে পাইপের কারখানা থাকলেও এই বিশেষ পাইপ বাংলাদেশে তৈরি হয় না, আমদানি করতে হয়। এই পাইপের শুল্ক এবং অন্যান্য খরচ প্রায় 93%। এতে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায় এবং ভবন মালিকরা নিরুৎসাহিত হন। শুধু তাই নয়, পোশাক শিল্প ও কিছু সেবা খাতের জন্য অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র আমদানিতে শুল্ক সুবিধা থাকলেও অন্যান্য শিল্পের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। কিন্তু অন্য শিল্পে আগুনের ঝুঁকি কি কম? গার্মেন্টসের তুলনায় প্লাস্টিক বা রাসায়নিক কারখানায় এই ঝুঁকি অনেক গুণ বেশি। আবার এই শুল্ক সুবিধা শুধুমাত্র প্রথমবারের জন্য। বিদ্যমান ভবন বা স্থাপনা সম্প্রসারণের জন্য এই সুবিধা পাওয়া যায়না।

৩) বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোডে অপর্যাপ্ত নিয়মনীতি:
বিএনবিসি অনুযায়ী বঙ্গবাজারে ম্যানুয়াল কল পয়েন্ট, পোর্টেবল ফায়ার এক্সটিংগুইশার এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট ইনস্টল করার প্রয়োজন ছিল। (বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী বঙ্গবাজার শপিং কমপ্লেক্স বাণিজ্যিক গ্রুপে ‘এফ টাইপ অকুপেন্সি, ‘মার্কেন্টাইল টাইপ 1’, ‘সাব ক্যাটাগরি এফ2 টাইপ’-এর অধীনে পড়ে)।
মাঝরাতে যখন কোনো স্থাপনায় আগুন লাগে, সেখানে কেউ না থাকলে ম্যানুয়াল কল পয়েন্ট কে পরিচালনা করবে? দ্বিতীয়ত, পোর্টেবল পোর্টেবল ফায়ার এক্সটিংগুইশার এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট ইনস্টল করতে বলা হয়। উভয়ই ম্যানুয়াল সিস্টেম, তাই মধ্যরাতে কোনও ব্যক্তি উপস্থিত না থাকলে এটি কাজ করবে না। আমাদের অবশ্যই সেই ধরণের বিপজ্জনক প্রাঙ্গনের জন্য স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৪) চলমান ডলার সংকট:
চলমান ডলারের সংকট আগুন নির্বাপক যন্ত্রের বাজারকে ব্যাহত করছে। এটি সম্পূর্ণ আমদানি ভিত্তিক বাজার। এল/সি খোলার জটিলতা নিয়ে ব্যবসায়ীরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, ফলে পন্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

৫) নিম্নমানের অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জাম:
নিম্নমানের অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানি রোধে তেমন কোনো নীতি বা কার্যকর কর্তৃপক্ষ নেই এবং নেই কোন পরীক্ষাগার নেই যেখানে অগ্নি নিরাপত্তা সরঞ্জাম গুলো পরীক্ষা করা যাবে।

৬) প্রযুক্তিগত দক্ষতা:
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্নি নিরাপত্তা বলে তেমন কিছু নেই। কিন্তু এখানে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ রয়েছে। স্কুল পর্যায় থেকেই অগ্নি নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। নিরাপদ ও সচেতন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এর কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই সংশ্লিষ্ট কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও জনবল দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

৭) পানির উৎস:
প্রতিটি অগ্নিনির্বাপক ট্রাক সর্বোচ্চ ১০-১৫ মিনিট একটানা লড়াই করতে পারে। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে আমাদের অবশ্যই অতিরিক্ত পানির উৎস প্রয়োজন, অন্যথায় আসলে ফায়ার ফাইটার কিছুই করতে পারে না। এই জন্য আমাদের প্রতিটি এলাকায় পুকুর/প্রাকৃতিক পানির উৎস বা বড় জলাধার প্রয়োজন। আরেকটি ভাল সমাধান হল রাস্তায় সক্রিয় স্ট্রিট ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম স্থাপন করা।

৮) বৈদ্যুতিক এবং গ্যাস সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম:
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৯৫% অগ্নি দুর্ঘটনা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে ঘটছে। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার, সকেট এবং বৈদ্যুতিক ফিটিংস অগ্নি দুর্ঘটনার অন্যতম কারন। একটা বিষয় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, সব কিছুরই একটা লাইফ টাইম থাকে, যে বিল্ডিং ৪০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল, সেটা কি এখনো নিরাপদ? স্পষ্টতই এর বৈদ্যুতিক তারের এবং ইউটিলিটি সরঞ্জাম গুলো সংশোধন করা দরকার। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা গুলো জন্য অদক্ষ টেকনিশিয়ানরাও দায়ী।

৯) জনসচেতনতা:
নিরাপত্তার জন্য সচেতনতা অত্যাবশ্যক। গণপর্যায়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে এই সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত আমাদের প্রতিটি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে নিরাপত্তা, নিয়মনীতি বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

১০) আইন প্রয়োগকারী:
বিধি-বিধান রক্ষায় সরকারকে কঠোর হতে হবে। অনতিবিলম্বে ঝুকি পূর্ণ স্থাপনা গুলো চিহ্নিত করতে, সেগুলো সংশোধন করতে হবে এবং তা নাহলে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এম মাহমুদুর রশিদ
সেক্রেটারি জেনারেল
ইসাব – ইলেক্ট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

You cannot copy content of this page